আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ইসলামি বিপ্লবের শহীদ নেতার শাহাদাত এবং তাঁর পবিত্র দেহ দাফন ও বিদায় উপলক্ষে আয়াতুল্লাহ রামেযানী ইসলামি উম্মাহর প্রতি শোক ও সহানুভূতি জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করেছেন।
বিবৃতির পূর্ণাঙ্গ পাঠ:
بسم الله الرحمن الرحیم
﴿وَالَّذِینَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ أُولَٰئِکَ هُمُ الصِّدِّیقُونَ وَالشُّهَدَاءُ عِنْدَ رَبِّهِمْ لَهُمْ أَجْرُهُمْ وَنُورُهُمْ ۖ وَالَّذِینَ کَفَرُوا وَکَذَّبُوا بِآیَاتِنَا أُولَٰئِکَ أَصْحَابُ الْجَحِیمِ﴾
আল্লাহর একনিষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ বান্দা—যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূল, আলী, ফাতিমা ও হুসাইনের (তাঁদের সবার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) বংশধর; একজন প্রাজ্ঞ আলেম ও ধর্মীয় আইনবিদ; আহলে বাইতের (আ.) অনুসারীদের জন্য ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বা ‘মারজা’; সংস্কারবাদী চিন্তাবিদ ও নবজাগরণের অগ্রদূত; ইসলামি উম্মাহ ও বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের নেতা; ‘ওয়ালি-ই-ফাকিহ’ (ইসলামি শাসনব্যবস্থার অভিভাবক-আইনবিদ) ও ন্যায়পরায়ণ শাসক; শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এক ক্লান্তিহীন ‘মুজাহিদ’; নিপীড়িত জনগোষ্ঠী, এ অঞ্চলের জাতিসমূহ, বিশ্ব-অহংকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম এবং ফিলিস্তিনের আদর্শ ও জনগণের রক্ষক ও সমর্থক; এবং প্রতীক্ষিত মাহদীর (আল্লাহ তাঁর মহিমান্বিত পুনরাবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন) আগমনের প্রত্যাশার পতাকাবাহী—সেই শহীদ ইমাম, হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসাইনি খামেনেয়ীর শাহাদাত ইসলাম, ইরানি জাতি, ইসলামি উম্মাহ এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য এক বেদনাদায়ক ক্ষতি ও অপূরণীয় আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান ও ইরাকের জনগণ এবং সমগ্র ইসলামি উম্মাহর পক্ষ থেকে এক ঐতিহাসিক বিদায়—তেহরানের বৃহৎ মোসাল্লা (সেই শহীদ ইমাম ও নেতার এক স্মৃতিচিহ্ন) থেকে শুরু করে ‘মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধরের আবাসস্থল’ (পবিত্র কোম—যেখানে রয়েছে ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর মাজার ও পবিত্র জামকারান মসজিদ); এরপর নাজাফ ও কারবালায় তাঁর মহান পূর্বসূরি আলী, হুসাইন ও আব্বাস (আ.)-এর পবিত্র মাজারসমূহ—যেখানে ইরাকের অকৃত্রিম ও অনুগত জনগণের কাঁধে করে তিনি পৌঁছেছিলেন; এবং পরিশেষে পবিত্র মাশহাদ, যেখানে—নিজের সেনাপতির সেবায় নিয়োজিত এক সৈনিকের মতো—‘আত্মার প্রশান্তি’ ও ‘সূর্যদের সূর্য’ (ইমাম রেযা আ.)-এর সান্নিধ্যে তুসের মাটিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
ইসলামি বিশ্বের জাগরণের লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা; দিকনির্দেশনা প্রদান এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নবি-সুলভ দায়িত্ব পালন; ইসলামি সমাজের উপলব্ধিকে গভীরতর করা ও এক নতুন ইসলামি সভ্যতার পথে এগিয়ে যাওয়া; আধুনিক যুগের অজ্ঞতা, সমকালীন দাসত্বের নানা রূপ এবং নব্য-উপনিবেশবাদকে উন্মোচন ও মোকাবিলা করার লক্ষ্যে বিষয়সমূহ স্পষ্ট করা ও অন্তর্দৃষ্টির বিকাশ ঘটানো; নিপীড়ন, স্বৈরাচার ও ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ; এবং—সর্বোপরি—উম্মাহর নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা প্রদানের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত এক জীবন শেষে তিনি গর্বের সাথে তাঁর প্রিয় স্রষ্টার সান্নিধ্যে চলে গেলেন।
এর মাধ্যমে ইতিহাসে তাঁর নাম অমর হয়ে রইল এমন একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে—যিনি তাঁর পূর্বপুরুষ ‘আমিরুল মুমিনিন’ আলি (আ.)-এর পর একমাত্র আলেম, ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, শাসক ও নেতা হিসেবে শাহাদাত বরণ করলেন।
বিশ্বের মুসলমানদের মহান নেতার শাহাদাত বরণ ইরানি জনগণ ও ইসলামি উম্মাহর জাগরণের সূচনা ঘটিয়েছিল। ইরানের বিভিন্ন জনচত্বরে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে লক্ষ লক্ষ মুক্তপ্রাণ মানুষের উপস্থিতি—যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল শহীদ ইমামের ঐতিহাসিক বিদায়ানুষ্ঠান এবং দুটি দেশের পাঁচটি শহরের মধ্য দিয়ে তাঁর পবিত্র দেহ বহনকারী শোভাযাত্রার মাধ্যমে (এমন একটি আয়োজন যাতে পরিস্থিতি অনুকূল হলে নিঃসন্দেহে সমগ্র ইসলামি উম্মাহ অংশ নিতে চাইত)—তা উম্মাহর নবজাগরণের এক অনন্য সাক্ষ্য বহন করে।
এটি বিশ্বব্যাপী ঔদ্ধত্য, সর্বগ্রাসী যুক্তরাষ্ট্র এবং অবৈধ জায়নবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুসলিম ও মুক্তিকামী মানুষের দৃঢ় সংকল্পের; এবং একইসাথে ‘জিহাদ’-এর ন্যায়সংগত পথ অনুসরণ ও ইসলামের গৌরব ও মহিমা পুনরুদ্ধারের অবিরাম যাত্রার প্রতীক। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী (আল্লাহ তাঁর ছায়া দীর্ঘস্থায়ী করুন)-এর নেতৃত্বে এই আন্দোলন এগিয়ে চলেছে।
বিজয় অর্জন, নতুন ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন, ত্রাণকর্তার (মাহদি আ.ফা.-এর পুনরাবির্ভাবের প্রতীক্ষা এবং ন্যায়বিচার ও সাম্যভিত্তিক সেই মহান শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে—যা ইসলাম ও এর অনুসারীদের জন্য এক পরম সম্মানের বিষয়।...
আমার এবং ‘আহলুল বাইত (আ.) বিশ্ব সংস্থার পক্ষ থেকে এবং বিশ্বজুড়ে সকল শিয়া, মুসলমান ও ন্যায়-পিপাসু মানুষের পক্ষ থেকে—এবং উম্মাহর সকল দরদি নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে একাত্ম হয়ে—আমি ইরানি জনগণ, ইসলামি উম্মাহ, বিভিন্ন সরকার ও সরকারি কর্মকর্তা, নানা ধর্ম ও মতাদর্শের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও পুরোহিতবর্গ, বিশ্ববরেণ্য চিন্তাবিদ ও বিশিষ্টজন, সমাজকর্মী এবং শহীদ ইমামের পথের সকল অনুসারীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
সেই ইতিহাস-সৃষ্টিকারী নেতার প্রতি নিজেদের কর্তব্য পালনের লক্ষ্যে তাঁরা স্বেচ্ছায় দীর্ঘ যাত্রাপথের কষ্ট ও কঠোরতা এবং এই ঐতিহাসিক আয়োজনে অংশগ্রহণের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন; আমি আশা করি, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কঠিন পরিস্থিতির মাঝে ইসলামি দেশ ইরানে অবস্থানকালে কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে থাকলে, তাঁরা তা উদারতা ও সহনশীলতার সাথে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে বিনীত প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের সকলকে সেই ঐশ্বরিক অঙ্গীকার পূরণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, সেই শহীদ ইমামের পথ অনুসরণ করার এবং আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার তৌফিক দান করেন।
والسلام علیکم ورحمة الله و برکاته
রেযা রামেযানী
আহলুল বাইত (আ.) বিশ্ব সংস্থার মহাসচিব
Your Comment